ফেব্রুয়ারি এলেই প্রতিবছর কিছু প্রশ্ন ফিরে আসে—বাংলা ভাষা কতটা মর্যাদা পেল? সরকারি অফিস ও উচ্চ আদালতে বাংলার অবস্থান এখন কোথায়? ইংরেজি ও আরবি শিক্ষা মাধ্যমে বাংলা কতটা স্থান পেল? উচ্চশিক্ষায় কতটা বাংলায়ন হলো? বায়ান্নর চেতনা অনুযায়ী আদিবাসীরা কি মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের সুযোগ পাচ্ছে? ফেব্রুয়ারি গেলেই প্রশ্নগুলো আমরা শীতের জামার মতো ভাঁজ করে আলমারিতে তুলে রাখি। আবার এক বছর পর সেগুলো বের হবে—কিছু আবেগ, কিছু বক্তৃতা, কিছু কর্মসূচি নিয়ে। তারপর আবার নীরবতা।
এই নীরবতা ও উদাসীনতার দায় সাধারণ মানুষের নয়; বরং নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, প্রশাসকদের। যাঁরা ভাষানীতির রূপরেখা ঠিক করেন, তাঁদের অদূরদর্শিতা ও দ্বৈত অবস্থানই এই সমস্যাকে স্থায়ী করে রেখেছে। দায়ী ব্যক্তিরাও অনেক ক্ষেত্রে দোষী নন। কারণ, তাঁরা বুঝতে পারেন না যে তাঁরা একটি ঐতিহাসিক প্রকল্পের ধারাবাহিকতা বহন করছেন। সব সময় সব ক্ষেত্রে বুঝতে পারেন না, তা–ও নয়। কারণ, বিভিন্ন সময়ে শিক্ষায় বাংলার ব্যবহার কমানোর সর্বাত্মক চেষ্টা লক্ষ করা গেছে।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিবিদ টমাস ব্যাবিংটন মেকলে ‘সুপ্রিম কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া’র সদস্য হিসেবে ঔপনিবেশিক ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনেন। তিনি সংস্কৃত ও ফারসির পরিবর্তে ইংরেজিকে শিক্ষার মাধ্যম করার পক্ষে যুক্তি দেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন একটি ব্রিটিশ প্রতিনিধি শ্রেণি তৈরি করা, যারা হবে ‘রক্তে-মাংসে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, মতামত, নৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিতে ইংরেজ’। এই নীতির ফলে আমাদের ব্রিটিশ প্রতিনিধিরা ইংরেজদের মতো হতে গিয়ে তৈরি করেছে হীনম্মন্যতা, সমাজে সৃষ্টি হয়েছে শ্রেণিদ্বন্দ্ব। এই নীতি প্রকৃতপক্ষে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতিরই অংশ।
দায় সাধারণ মানুষের নয়; বরং নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, প্রশাসকদের। যাঁরা ভাষানীতির রূপরেখা ঠিক করেন, তাঁদের অদূরদর্শিতা ও দ্বৈত অবস্থানই এই সমস্যাকে স্থায়ী করে রেখেছে। দায়ী ব্যক্তিরাও অনেক ক্ষেত্রে দোষী নন। কারণ, তাঁরা বুঝতে পারেন না যে তাঁরা একটি ঐতিহাসিক প্রকল্পের ধারাবাহিকতা বহন করছেন।